ইউক্রেনে গুলি-বোমার আতঙ্কের মধ্যে রোজা, কঠিন পরিস্থিতিতে মুসলিমরা
অনলাইন ডেস্কঃ
প্রকাশিত: ০৪:০৪ পিএম, শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২ আপডেট: ০৪:০৪ পিএম, শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২
ইউক্রেনে এ বছর পবিত্র রমজান মাসে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছেন দেশটির মুসলিমরা। চারপাশ থেকে গুলি আর আকাশ থেকে বোমা পড়ার আতঙ্কের মধ্যেই রোজা পালন করতে হচ্ছে তাঁদের।
দিন যত যাচ্ছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানও তত জোরালো হচ্ছে। ঘোলাটে হচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। অথচ দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের অপরিহার্য সহায়তার অনেক পরিকল্পনাই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
নায়ারা নিমাতোভা একজন ক্রিমিয়ান তাতার ও মুসলিম লিগ অব ইউক্রেনের প্রধান। তাঁর স্বামী মুহাম্মদ মামুতোভ একজন ইমাম। নিমাতোভা বলেন, ‘আমাদের সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।’
রোজার মাসটিতে নিমাতোভার পরিকল্পনা, চেরনিভিৎসি শহরের ইসলামিক সেন্টারে তাঁর সঙ্গে থাকা বাস্তুচ্যুত মুসলিমদের সঙ্গে ইফতার করবেন তিনি।
মুঠোফোনে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ওই শহর থেকে আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলছিলেন নিমাতোভা। বলছিলেন, যুদ্ধ শুরুর পর বহু মুসলিম দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এখনো যাঁরা আছেন, তাঁদের সহায়তা করা প্রয়োজন। তিনি নিজেও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ জাপোরিঝঝিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ প্রদেশের একটি অংশ এখন রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর গত পাঁচ সপ্তাহে ১ কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ লোক আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী দেশগুলোতে।
অর্থডক্স খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত ইউক্রেনের প্রায় ১ শতাংশ অধিবাসী মুসলিম। দেশটিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ২০ হাজারের বেশি তুর্কি নাগরিক বসবাস করতেন। পাশাপাশি ছিলেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তার্কিক জনগণ, যাঁদের অধিকাংশ ক্রমিয়ান তাতার।
এসব মুসলিমের জন্য এবারের রমজান মাসটা একেবারেই ভিন্ন। রাশিয়ার দফায় দফায় বোমা হামলায় তছনছ ইউক্রেনের শহরগুলো। বিভিন্ন স্থানে জারি করা হয়েছে কারফিউ; সন্ধ্যায় চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা। পবিত্র রমজানের মাসজুড়ে সারা দিন রোজা রেখে ঠিক এ সময়ে ইফতারের জন্য একত্র হন মুসলিমরা। অথচ যুদ্ধের কারণে এবার অন্যদের মতোই বাস্তুচ্যুত মুসলিমরা নিজ সম্প্রদায়, পরিবার ও বন্ধুবান্ধব থেকে আলাদা হয়ে পড়েছেন।
নিমাতোভা বলেন, ‘আমাদের পরিবারের জন্য, নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাতের জন্য ও নিজেদের দেশ ইউক্রেনের জন্য প্রার্থনা করতে এবং আল্লাহর ক্ষমা পেতে (যুদ্ধের মধ্যেই) রমজান মাসে আমাদের তৈরি থাকতে হবে।’
নিমাতোভাকে এর আগেও ঘর ছাড়তে হয়েছে। সেটা ২০১৪ সালে। সে বছর ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় রাশিয়া। ফলে সপরিবার তাঁকে পালিয়ে যেতে হয় জাপোরিঝঝিয়ায়।
নিমাতোভা বলেন, ‘আমরা যখন ক্রিমিয়ায় বাস করতাম, কখনো ভাবিনি আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে হবে। বহু আগে আমাদের লোকজনকে (ক্রিমিয়ার তাতার জনগোষ্ঠী) সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন ক্রিমিয়া থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন।
তবে আমার দাদা-দাদি ও বাবা-মা সব সময় সেখানে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।’
১৯৪৪ সালে স্তালিনের নির্দেশে ক্রিমিয়ায় বসবাস করা তাতার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ১ লাখ ৯১ হাজারের বেশি সদস্যকে উজবেকিস্তানে নির্বাসনে পাঠানো হয়। পরে ১৯৮৮ সালে নিমাতোভার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তাঁর পরিবার আবার ক্রিমিয়ায় ফিরে আসে।
নিমাতোভা বলেন, ‘এরপর ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। আর আমরা বুঝতে পারি, এখানে আমাদের ধর্ম পালন করতে পারব না। তাই চলে যাই। এখন আবার আমাদের ঘর ছেড়ে যেতে হচ্ছে।’
এবারের রমজান মাস ঘিরে নিমাতোভার নানা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে রমজানে ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা ও গৃহহীনদের খাবার দেওয়ার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। তবে যুদ্ধের মধ্যেও ধর্মীয় শিক্ষা চর্চার কিছুটা অনলাইনেই চালিয়ে নেওয়া যাবে।
জাপোরিঝঝিয়ায় মুসলিমদের মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য ছিল বলে উল্লেখ করেন নিমাতোভা। এ নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘শহরটিতে নানা জাতিগোষ্ঠী থেকে আসা মুসলিমরা বসবাস করতেন। রোজায় সবাই নিজেদের দেশের খাবার রান্না করতেন। এক দিন হয়তো আমরা ভারতীয় বিরিয়ানি খেতাম, অন্যদিন থাকত ফিলিস্তিনি মান্তসেভ (ফিলিস্তিনের স্থানীয় বিশেষ খাবার) বা উজবেকিস্তানের পোলভ (বিরিয়ানি জাতীয় খাবার)।’
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ভুক্তভোগীদের একজন এই নারী বলেন, ‘আগে রোজার সময় আমরা সাইরেন শুনে ইফতার ও সাহ্রি করতাম। এখন সাইরেন শুনলে লুকিয়ে পড়ি। আমরা জানি না কাল কী হবে। এটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে কঠিন যুদ্ধ। মনে হয় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমাদের বয়স ১০ বছর বেড়ে গেছে।’
২০১০ সাল থেকে ইউক্রেনে বসবাস করেন ঈসা সেলেবি। নিমাতোভার মতো তিনিও চলমান যুদ্ধের একজন ভুক্তভোগী। মুসলিম এই ব্যক্তি বলেন, যুদ্ধের কারণে এ বছর রমজান মাসে অনেককেই বাসা থেকে দূরে থাকতে হবে।
সেলেবি বলেন, ‘রমজান কিংবা যুদ্ধ, সব সময়ই আমাদের বাড়ির দরজা সবার জন্য খোলা রাখি। আমরা রুটি ভাগাভাগি করে খাব।’ তবে যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যের দাম যখন বাড়ছে, তখন কিছু খাবারের মজুত কমে এসেছে বলে জানান তিনি।
যুদ্ধ মানুষের জীবনের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে সেলেবি বলেন, ‘আমরা বেঁচে থাকার জন্য একরকম লড়াই করছি। আমার ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, এক বা দুই বছরের মধ্যে এর (যুদ্ধের) শেষ দেখব।
ভালো দিনগুলো আবার ফিরে আসবে। এ কারণেই আমি দেশ ছেড়ে যাইনি।’
যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে নিজ শহর ভিনিৎসিয়া থেকে ৪০০ তুর্কি মুসলিম ও ইউক্রেনীয়কে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন সেলেবি। আর এখন ১ হাজার এতিম শিশুকে দেখভালে সাহায্য করছেন তিনি। বলেন, ‘আমি এ বছরের জাকাতের পুরোটাই তাদের (এতিম) দেব।’
সর্বশেষ সেলেবি আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘ইউক্রেনীয়রা ভালো মানুষ। তাঁদের দুঃখ-কষ্ট কমাতে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। ইউক্রেনীয়দের সমর্থনের জন্য আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাব।
সূত্র: আল-জাজিরা